শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৫:১৭ অপরাহ্ন

এমপি লীগ ভাই লীগের বলয় ভাঙতে শেখ হাসিনার কঠিন বার্তা

এমপি লীগ ভাই লীগের বলয় ভাঙতে শেখ হাসিনার কঠিন বার্তা

ডেইলি সিলেট মিডিয়াঃ ‘এখন আর কেউ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ করে না, সবাই এখন ভাই লীগ, এমপি লীগের সদস্য’- সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আইয়ুবুর রহমান রাজন তালুকদার তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল এমন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। শুধু তাড়াশেই নয়, এখন দেশের সব জেলা-উপজেলায় সংগঠন চলছে ‘এমপি লীগ’ ও ‘ভাই লীগ’ দিয়ে।

সূত্রমতে, দল টানা ক্ষমতায় থাকায় গত এগারো বছরে নিজ বলয় শক্তিশালী করতে স্থানীয় এমপি-মন্ত্রী ও জেলা-উপজেলার শীর্ষ নেতারা বিএনপি-জামায়াত থেকে লোকদের নিয়ে অথবা নিজ আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘এমপি লীগ’, ‘ভাই লীগ’। এমপি-মন্ত্রী বা কেন্দ্রীয় নেতাদের ছেলে, আত্মীয়স্বজনরাও পিছিয়ে নেই। তারাও গড়ে তুলেছেন লুটেপুটে খাওয়া বিশেষ লীগ বাহিনী। শুধু তাই নয়, এগারো বছরে শত শত অনুপ্রবেশকারীকে দেওয়া হয়েছে দলের পদ-পদবিও। কেউ কেউ উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন শীর্ষ পদেও। সর্বত্র এই লীগের দাপটে কোণঠাসা দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীরা। হাইব্রিডদের দাপটে ১৯৯১ থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের আগে যারা দলে সক্রিয় ছিলেন, ঝুঁকি নিয়েছেন তারা নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করেছেন। বিষয়টি দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে আসায় এই বলয় ভাঙার নির্দেশ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতাদের। গত সপ্তাহে গণভবনে দলীয় সভানেত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যান আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতা। অনির্ধারিত আলোচনায় জেলা-উপজেলায় গড়ে ওঠা এসব বলয় ভাঙার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। এ ছাড়া যারা ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মী তাদেরকে মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ‘গত এগারো বছর দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় অনেক জায়গায় বিশেষ বলয় সৃষ্টি হয়েছে। সভানেত্রী এ বলয় ভেঙে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। চলতি মাসে শুরু হওয়া জেলা-উপজেলা সম্মেলনে হাইব্রিডদের বিদায় জানিয়ে দুঃসময়ের কর্মীদের মূল্যায়ন করা হবে।’

দলীয় সূত্রমতে, দল টানা এগারো বছর ক্ষমতায় থাকায় জেলা-উপজেলায় গড়ে ওঠা ‘এমপি লীগ’ ও ‘ভাই লীগ’ নামক বিশেষ লীগের বলয় ভাঙাসহ চার নির্দেশনা দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ নির্দেশনার মধ্যে আরও রয়েছে- আগামী ৬ মার্চের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা-উপজেলা সম্মেলন শেষ করা। এতে শীর্ষ পদ পেতে কমপক্ষে এক যুগ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকতে হবে। দলের সদস্য সংগ্রহ জোরদার ও মুজিববর্ষ উপলক্ষে দলীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা। দলীয় সভানেত্রীর এ নির্দেশনা নিয়ে মাঠে কাজ শুরু করেছেন শীর্ষ নেতারা। তারা জেলায় জেলায় বর্ধিত সভা করে সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত করছেন।

এ প্রসঙ্গে যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বড় একটি রাজনৈতিক দল। মাটি ও মানুষের দল। এ দলের রাজনীতির সঙ্গে দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত আছে। এখানে ভালো-খারাপ দুই শ্রেণির মানুষ আসতেই পারে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে এটা যাচাই-বাছাই করা কি সম্ভব? তাই যাচাই-বাছাই করতে একটু সময় লাগবেই। এ বিষয়ে আমাদের সভানেত্রী কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগকে হাইব্রিডমুক্ত করার মাধ্যমে তৃণমূলে সৃষ্ট ভাই লীগ ও এমপি লীগ ভাঙা হচ্ছে।’ দলীয় সূত্রমতে, সারা দেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করতে সাংগঠনিক থানা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ডসহ সব ইউনিটকে আগামী ৬ মার্চের মধ্যে সম্মেলন শেষ করার নির্দেশনা দিয়ে তৃণমূলে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া সারা দেশে ‘সদস্য সংগ্রহ অভিযান’ জোরদার করতেও তৃণমূলকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ওই চিঠিতে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি দলের দফতর থেকে তৃণমূলকে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে। দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা ছুটে চলেছেন জেলায় জেলায়। গতকাল পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা হয়। এতে প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। পরে পৃথকভাবে জেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠক করেন রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন। এ সময় পাবনার পাঁচটি উপজেলার সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘দলীয় সভানেত্রীর বার্তা নিয়ে আমরা মাঠে কাজ শুরু করেছি। ভাই লীগের দিন শেষ। এখন খুঁজে খুঁজে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার কর্মী বের করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘মুজিববর্ষের আবহ সামনে রেখে ১ মার্চ রাজশাহী মহানগরী, ৫ মার্চ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাবনার পাঁচ উপজেলা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সব উপজেলার সম্মেলন শেষ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল (শনিবার) বগুড়া, নওগাঁ জেলার বর্ধিত সভা ও বৈঠক করে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করব।’

সম্মেলনের তাগিদ: এদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বিকালে প্রথমে ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের চার নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে ২১ ফেব্রুয়ারির আগেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন তিনি। এরপর বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, জাতীয় মৎস্যজীবী লীগ, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন জাতীয় শ্রমিক লীগের শীর্ষ ও ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে। বৈঠকে যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। গত বছরের নভেম্বরে যুবলীগ, কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও মৎস্যজীবী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া আগামী মার্চে মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ ও তাঁতী লীগের মেয়াদ শেষ হবে। এ সংগঠনগুলোর সম্মেলনের জন্য আগামী এপ্রিলকে বেছে নিতে বলা হয়েছে। বৈঠকে যুব মহিলা লীগের সভানেত্রী নাজমা আকতার বলেন, ‘মার্চে যুব মহিলা লীগের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হবে। আমাদের সম্মেলনের তারিখ দিতে পারেন।’ এ সময় ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যাদের মেয়াদ শেষ হবে বা হয়েছে তাদেরকে এপ্রিলে সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। নেত্রী সম্মত হলেই সম্মেলনের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে।’

এ ছাড়া ছাত্রলীগের যেসব জেলা ও সাংগঠনিক ইউনিটে সম্মেলন হয়েছে কিন্তু কমিটি ঘোষণা হয়নি সেগুলোয় দ্রুত কমিটি দিতে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নির্দেশ দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, কবি নজরুল ইসলাম কলেজসহ বেশ কয়েকটি শাখায় সম্মেলন হলেও কমিটি ঘোষণা করা হয়নি। এগুলোর দ্রুত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2017 Bditfactory.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ