শুক্রবার, ০৫ Jun ২০২০, ০১:১৯ অপরাহ্ন

শীর্ষ সংবাদ :
নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে

নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে

সালাহ উদ্দিন বিজয়ঃ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেছেন, বন ও জীববৈচিত্র্য প্রতিবেশ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন ও বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরিবেশ, প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেমে আসে বিপর্যয়।আর জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হলে মানুষের অস্তিত্বের ওপর আসে আঘাত। তাই সমবেত প্রচেষ্টায় সুরক্ষিত রাখতে হবে দেশের বন ও জীববৈচিত্র্য।

শুক্রবার (২২ মে) বন অধিদফতরের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনলাইন আলোচনা সভায় নিজের সরকারি বাসভবন থেকে যুক্ত হয়ে মন্ত্রী এ কথা বলেন।

শাহাব উদ্দিন বলেন, প্রতিবছর ২২ মে আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস পালন করা হয়। জীববৈচিত্র্যের টেকসই উন্নয়ন মানবকল্যাণের জন্য অপরহার্য। জীববৈচিত্র্য হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। বিশ্ব অর্থনীতির ৪০ শতাংশ এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চাহিদার ৮০ শতাংশ আসে জৈবসম্পদ থেকে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রয়োজনে ধ্বংস হচ্ছে বন-বনানী। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচুর্যময় স্থলজ ও জলজ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। তাই এখনই উপযুক্ত সময় এই প্রাচুর্য হারিয়ে ফেলার আগেই তা রক্ষায় একযোগে কাজ করার।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বনাঞ্চলসমূহ, অভ্যন্তরীণ জলাভূমিসমূহ এবং বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিপুল জীববৈচিত্র্যের সমাহার। বাংলাদেশে প্রাণীবৈচিত্র্যের মধ্যে আছে ১৩০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭১১ প্রজাতির পাখি, ১৬৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৬ প্রজাতির উভচর, ৬৫৩ প্রজাতির মাছ, যার মধ্যে ২৫১ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ এবং ৪০২ প্রজাতির লোনা পানির মাছ। এছাড়াও রয়েছে বৈচিত্র্যময় হাঙরসহ নানা প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী। উদ্ভিদ প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশে ১৯৮৮ প্রজাতির শৈবাল, ২৭৫ প্রজাতির ছত্রাক, ২৪৮ প্রজাতির মস জাতীয় উদ্ভিদ, ১৯৫ প্রজাতির ফার্ন জাতীয় উদ্ভিদ, ৭ প্রজাতির নগ্নবীজি এবং ৩ হাজার ৬১১ প্রজাতির গুপ্তবীজি উদ্ভিদ।’

অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ, প্রাকৃতিক সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড়, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস, দূষণ, বন্যপ্রাণী শিকার ও হত্যার ফলে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য হুমকির মুখে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, একসময় বাংলাদেশের প্রায় ১৭টি জেলায় বাঘ ছিল। কিন্তু বর্তমানে শুধু সুন্দরবনে বাঘ সীমাবদ্ধ রয়েছে। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে এক শিংওয়ালা গন্ডার, ময়ূর, বুনো গরু, বুনো মহিষ মিঠা পানির কুমিরসহ ৩১ প্রজাতির প্রাণী।

শাহাব উদ্দিন বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেমে আসা বিপর্যয় মোকাবিলায় আমাদের সরকার বদ্ধ পরিকর। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান আইন, ২০১১-এর ১২ ধারাবলে ১৮ক অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের সংবিধানে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ বিষয়ক ধারা সন্নিবেশিত করেন; যাতে বলা হয়েছে “রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবেন।” এছাড়া দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য সরকার বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এবং বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য আইন-২০১৭ প্রণয়ন করে। আইনের আলোকে বাংলাদেশের সর্বমোট ৪৮টি রক্ষিত এলাকা ঘোষিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি অভয়ারণ্য এবং ১৮টি জাতীয় উদ্যান, ২টি বিশেষ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা, ১টি মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া, ৩টি ইকোপার্ক ও ১টি উদ্ভিদ উদ্যান রয়েছে। এছাড়া ২টি ভালচার সেফ জোন রয়েছে।

বাঘ, হাতি ও কুমিরের আক্রমণে নিহত ও আহত পরিবারকে সহায়তা দেয়ার জন্য ২০১০ সালে ‘বন্যপ্রাণীর আক্রমণে জানমালের ক্ষতিপূরণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, বন্যপ্রাণী কর্তৃক নিহত ব্যক্তির পরিবারকে এক লাখ ও আহত ব্যক্তির পরিবারকে ৫০ হাজার করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় । ইতোমধ্যেই বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণবাদী ব্যক্তি, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য বিষয়ক শিক্ষা ও গবেষণায় নিয়োজিত ব্যক্তি এবং সংস্থাকে জাতীয়ভাবে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ‘বঙ্গবন্ধু অ্যাওয়ার্ড ফর ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন’ প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রতি বছর মোট তিনটি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হচ্ছে। সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কার্যক্রম এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বর্তমানে বাংলাদেশের বৃক্ষ আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ দেশের মোট আয়তনের ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের মধ্যে ২৪ শতাংশের বেশি উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, সহযোগিতামূলক বন ব্যবস্থাপনা এবং বন নির্ভর মানুষের বিকল্প আয়ের সুযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে বনের উন্নয়ন করার লক্ষ্যে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানার বিরোধ নিষ্পত্তি করেছে। এখন এই সুনির্দিষ্ট সমুদ্রসীমানার মধ্যে আমাদের জীববৈচিত্র্য ও অন্যান্য সমুদ্রসম্পদের বিষয়ে জ্ঞান, অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও আহরণ সবই বাড়ানো হবে। আর এজন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বন অধিদফতরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব জিয়াউল হাসান, অতিরিক্ত সচিব ড. মো. বিল্লাল হোসেন; পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. এ. কে. এম. রফিক আহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মো. জসীম উদ্দিন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মনিরুল এইচ খান এবং প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2017 Bditfactory.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ